মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নগুলোর একটি—আমি কেন সৃষ্টি হয়েছি?

আমরা পৃথিবীতে আসি, বড় হই, পড়াশোনা করি, জীবিকার জন্য পরিশ্রম করি, পরিবার গঠন করি। জীবনে আনন্দ আসে, আবার দুঃখ আসে। কখনো প্রাপ্তি, কখনো হারানো; কখনো সুস্থতা, কখনো অসুস্থতা। এভাবে একসময় মৃত্যু এসে আমাদের দুনিয়ার জীবন শেষ করে দেয়।

তাহলে এত কিছুর উদ্দেশ্য কী? মানুষ কি শুধু কিছু বছর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্যই সৃষ্টি হয়েছে?

কুরআন এর খুব পরিষ্কার একটি উত্তর দিয়েছে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন—

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

“আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের জন্য।”

—সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬

অর্থাৎ আমাদের সৃষ্টি উদ্দেশ্যহীন নয়। চাকরি, ব্যবসা, অর্থ-সম্পদ, বাড়ি, পরিবার—এসব আমাদের দুনিয়ার জীবনের অংশ। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই মানুষের অস্তিত্বের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়।

চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো নিজের স্রষ্টাকে চেনা, তাঁর ইবাদত করা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করা।

মানুষকে কেন সরাসরি জান্নাতে সৃষ্টি করা হলো না?

আল্লাহ চাইলে আমাদের এমন একটি জগতেও সৃষ্টি করতে পারতেন যেখানে কোনো দুঃখ নেই, কোনো পরীক্ষা নেই, কোনো পাপের সুযোগ নেই।

কিন্তু আল্লাহ এই দুনিয়ার জীবন সম্পর্কে বলেছেন—

الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا

“যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন—কে কাজে উত্তম।”

—সূরা আল-মুলক, ৬৭:২

এখানে একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহ বলেননি—কে সবচেয়ে বেশি সম্পদের মালিক হলো, কে সবচেয়ে ক্ষমতাবান হলো কিংবা কে সবচেয়ে আরামদায়ক জীবন পেল।

তিনি বলেছেন—কে কাজে উত্তম।

অর্থাৎ এই দুনিয়া শুধু ভোগ করার জায়গা নয়। এটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা, নিজেকে গড়ে তোলার জায়গা এবং পরীক্ষার জায়গা।

মানুষের সামনে ভালো এবং মন্দ—দুই পথই রয়েছে। সে অন্যায় করার সুযোগ পেয়েও অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে। হারাম হাতের নাগালে থাকার পরও আল্লাহর ভয়ে তা ছেড়ে দিতে পারে। বিপদে হতাশ হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ধৈর্য ধারণ করতে পারে।

আর এখানেই মানুষের সিদ্ধান্তের মূল্য।

কষ্ট না এলে ধৈর্যের পরীক্ষা কোথায় হতো? ভয় না থাকলে সাহস প্রকাশ পেত কীভাবে? অভাব না থাকলে কৃতজ্ঞতার গভীরতা কতটুকু বোঝা যেত? অন্যায় করার সুযোগই যদি না থাকত, তাহলে ন্যায়কে বেছে নেওয়ার পরীক্ষাই বা কোথায় থাকত?

এগুলোকে মানুষ সৃষ্টির আলাদা কোনো কারণ হিসেবে কুরআন ঘোষণা করেনি। তবে দুনিয়াকে পরীক্ষার স্থান হিসেবে বুঝতে গেলে এর হিকমাহ সম্পর্কে এভাবে চিন্তা করা যায়।

স্বাধীন ইচ্ছাই মানুষকে দায়িত্বশীল করে

প্রকৃতির দিকে তাকালে আমরা দেখি সূর্য তার নির্ধারিত নিয়মে চলছে, গ্রহ-নক্ষত্র তাদের কক্ষপথ অনুসরণ করছে। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী ফেরেশতারাও আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেন না।

কিন্তু মানুষের সামনে নির্বাচন করার সুযোগ রয়েছে।

আল্লাহ বলেন—

إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا

“নিশ্চয়ই আমি তাকে পথ দেখিয়েছি—সে হয় কৃতজ্ঞ হবে, নয়তো অকৃতজ্ঞ।”

—সূরা আল-ইনসান, ৭৬:৩

আল্লাহ মানুষকে পথ দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে তাকে নির্বাচন করার সুযোগও দিয়েছেন।

যদি মানুষকে এমনভাবে তৈরি করা হতো যে সে অন্যায় করতেই পারবে না, তাহলে তার আনুগত্য এবং এমন একজন মানুষের আনুগত্য—যে অন্যায় করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর জন্য নিজেকে সংযত করেছে—এক বিষয় হতো না।

এই নির্বাচনই মানুষের কাজকে অর্থবহ করে এবং এই নির্বাচনের কারণেই আসে জবাবদিহি।

আধুনিক AI আমাদের একটি বিষয় ভাবতে শেখায়

আজকের Artificial Intelligence-এর যুগে বিষয়টি বোঝার জন্য একটি সীমিত উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে।

একজন প্রোগ্রামার একটি সাধারণ প্রোগ্রাম তৈরি করলেন। তাকে নির্দিষ্ট কিছু নির্দেশ দেওয়া হলো। নির্দিষ্ট input পেলে সে নির্দিষ্ট output দেবে।

প্রোগ্রামটি নিজের নির্মাতাকে প্রশ্ন করে না—

“আমাকে কেন তৈরি করা হয়েছে?”

তার নির্মাতা যে উদ্দেশ্যে তাকে তৈরি করেছেন, সেই উদ্দেশ্য প্রোগ্রামটির নিজের তৈরি করা নয়।

AI এবং মানুষের মধ্যে অবশ্যই মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তাই AI মানুষের সৃষ্টি বা ধর্মীয় সত্যের কোনো প্রমাণ নয়। কিন্তু উদাহরণটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে সাহায্য করে।

সৃষ্টি তার নিজের অস্তিত্বের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে না; স্রষ্টাই তার উদ্দেশ্য সবচেয়ে ভালো জানেন।

তাই একজন মানুষ যদি বলে, “আমি আমার জীবনের কোনো উদ্দেশ্য দেখতে পাচ্ছি না”, তার অর্থ এই নয় যে তার জীবনের কোনো উদ্দেশ্যই নেই।

আর মানুষের ক্ষেত্রে স্রষ্টা সেই উদ্দেশ্য গোপনও রাখেননি।

তিনি বলেছেন—

“আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের জন্য।”

—সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫৬

কুরআন মানুষকে চিন্তা করতে বলে

কুরআনের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি মানুষকে বারবার চিন্তা করতে, দেখতে এবং পর্যবেক্ষণ করতে আহ্বান জানায়।

আল্লাহ বলেন—

مَّا تَرَىٰ فِي خَلْقِ الرَّحْمَٰنِ مِن تَفَاوُتٍ ۖ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَىٰ مِن فُطُورٍ

“দয়াময়ের সৃষ্টিতে তুমি কোনো অসামঞ্জস্য দেখতে পাবে না। আবার দৃষ্টি ফেরাও—কোনো ত্রুটি দেখতে পাও কি?”

—সূরা আল-মুলক, ৬৭:৩

এর পরের আয়াতে আবারও দৃষ্টি ফেরাতে বলা হয়েছে।

দেখুন। আবার দেখুন। পর্যবেক্ষণ করুন।

মহাবিশ্বের দিকে তাকান। নিজের শরীরের দিকে তাকান। জীবন ও মৃত্যুর দিকে তাকান। সৃষ্টির নিয়ম ও ভারসাম্য নিয়ে চিন্তা করুন।

এমনকি আল্লাহ আমাদের নিজেদের নিয়েও চিন্তা করতে বলেছেন—

وَفِي أَنفُسِكُمْ ۚ أَفَلَا تُبْصِرُونَ

“আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও নিদর্শন রয়েছে। তবুও কি তোমরা দেখবে না?”

—সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:২১

আমার শরীর কীভাবে গঠিত হলো? আমার চিন্তা করার ক্ষমতা কোথা থেকে এলো? কেন আমি ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য নিয়ে ভাবি? কেন মানুষ শুধু বেঁচে থাকতে চায় না, বরং নিজের জীবনের অর্থও জানতে চায়?

এসব নিয়ে চিন্তা করাও মানুষের সত্য অনুসন্ধানের অংশ।

পরীক্ষা সবার একরকম নয়

পৃথিবীর দিকে তাকালে একটি বিষয় আমাদের বিচলিত করতে পারে।

কেউ ধনী পরিবারে জন্মায়, কেউ দরিদ্র পরিবারে। কেউ সুস্থ, কেউ জন্ম থেকেই অসুস্থ। কেউ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বড় হয়, আবার কারও জীবন কাটে যুদ্ধ, দুর্যোগ কিংবা অনিশ্চয়তার মধ্যে।

তাহলে সবার পরীক্ষা এক হলো কীভাবে?

আসলে ইসলামের দৃষ্টিতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সবার জন্য একই নয়।

আল্লাহ বলেন—

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا

“আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।”

—সূরা আল-বাকারা, ২:২৮৬

একজনের পরীক্ষা হতে পারে সম্পদ। অন্যজনের পরীক্ষা অভাব।

একজনের পরীক্ষা ক্ষমতা। অন্যজনের পরীক্ষা দুর্বলতা।

একজনের পরীক্ষা সুস্থতা। অন্যজনের পরীক্ষা অসুস্থতা।

তাই পৃথিবীতে কে কতটা পেল—শুধু সেটাই শেষ বিচারের মাপকাঠি নয়। বরং যা তাকে দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে সে কী করেছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

আমার জীবনেই এত বিপদ কেন?

বিপদ যখন একের পর এক আসে, তখন আমাদের মনে খুব স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন তৈরি হয়—

“আমার সাথেই কেন এমন হচ্ছে? অন্যরা তো ভালো আছে। আমার জীবনেই এত পরীক্ষা কেন?”

কিন্তু আমরা অন্য মানুষের জীবনের শুধু বাইরের অংশটুকু দেখি। কে ভেতরে কী পরীক্ষা পার করছে, তা আমরা জানি না। আর আল্লাহ প্রত্যেক মানুষকে একইভাবে পরীক্ষা করেন না।

কখনো সম্পদ দিয়ে পরীক্ষা করেন, কখনো অভাব দিয়ে। কাউকে সুস্থতা দিয়ে, কাউকে অসুস্থতার মাধ্যমে। কারও পরীক্ষা পরিবার, কারও জীবিকা, কারও সন্তান, আবার কারও পরীক্ষা নিজের নফস ও ঈমান নিয়ে।

তাই বিপদ আসা মানেই আল্লাহ আমাকে অপছন্দ করেন—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।

বরং ঈমানদারদেরও পরীক্ষা করা হবে—কুরআন এ ব্যাপারে অত্যন্ত পরিষ্কার।

আল্লাহ বলেন—

أَحَسِبَ ٱلنَّاسُ أَن يُتْرَكُوٓا۟ أَن يَقُولُوٓا۟ ءَامَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ ۝ وَلَقَدْ فَتَنَّا ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ

“মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষা করেছি।”

—সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:২–৩

অর্থাৎ ঈমানের জীবন মানেই পরীক্ষাহীন জীবন নয়।

পরীক্ষার মধ্যেই প্রকাশ পায় আমরা আল্লাহর উপর কতটা ভরসা করি, বিপদের সময় কতটা ধৈর্য ধারণ করি এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও তাঁর নির্দেশের উপর কতটা অটল থাকি।

একটি পরীক্ষা শেষ হলে আবার পরীক্ষা কেন?

কখনো আমরা ভাবি—একটি কঠিন সময় তো পার করলাম। অনেক ধৈর্য ধরলাম, আল্লাহর উপর ভরসা রাখলাম। তাহলে আবার নতুন পরীক্ষা কেন?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে।

একটি পরীক্ষা সফলভাবে অতিক্রম করার অর্থ এই নয় যে একজন মুমিনের জীবনে আর কোনো পরীক্ষা আসবে না। বরং পরবর্তী পরীক্ষাও তার জন্য নতুন নেক আমল, সবর, তাওয়াক্কুল এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগ হতে পারে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

إِنَّ عِظَمَ الْجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ الْبَلَاءِ

“নিশ্চয়ই বড় পরীক্ষার সাথে রয়েছে বড় প্রতিদান।”

—জামে আত-তিরমিযী, ২৩৯৬

আরেকটি হাদিসে আরও গভীর একটি বিষয় এসেছে। কোনো বান্দার জন্য আল্লাহর কাছে এমন একটি মর্যাদা নির্ধারিত থাকতে পারে, যেখানে সে শুধু নিজের আমল দ্বারা পৌঁছাতে পারছে না। তখন আল্লাহ তাকে তার নিজের জীবন, সম্পদ বা সন্তান-সন্ততির ব্যাপারে পরীক্ষার সম্মুখীন করেন এবং তাকে সবর করার তাওফিক দেন, যতক্ষণ না সে সেই মর্যাদায় পৌঁছে যায়।

—সুনান আবু দাউদ, ৩০৯০

এই হাদিস আমাদের বিপদকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিতে পারে।

বারবার পরীক্ষা আসা মানেই আগের পরীক্ষায় আপনি ব্যর্থ হয়েছেন—এমন নয়। হতে পারে নতুন পরীক্ষার মধ্যে আপনার জন্য আরও সবর করার, আরও দোয়া করার, আরও আল্লাহমুখী হওয়ার এবং আখিরাতের জন্য আরও প্রতিদান অর্জনের সুযোগ রয়েছে।

পরীক্ষার মধ্যেও রয়েছে উচ্চ মর্যাদা অর্জনের সুযোগ

আখিরাতে সবার মর্যাদা এক হবে না। জান্নাতেও রয়েছে বিভিন্ন স্তর ও মর্যাদা। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের আল্লাহর কাছে সর্বোচ্চ জান্নাত আল-ফিরদাউস চাইতে শিখিয়েছেন।

আল্লাহ বলেন—

وَلَلْآخِرَةُ أَكْبَرُ دَرَجَاتٍ وَأَكْبَرُ تَفْضِيلًا

“আর আখিরাত তো মর্যাদার স্তরে আরও বড় এবং শ্রেষ্ঠত্বেও আরও বড়।”

—সূরা আল-ইসরা, ১৭:২১

তাই একজন মুমিনের জীবনে পরীক্ষা আসলে সেটিকে শুধু দুঃখ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। সেই পরীক্ষার মধ্যেই সবর, তাকওয়া, তওবা, দোয়া এবং আল্লাহর উপর ভরসার মাধ্যমে আখিরাতে উচ্চ মর্যাদা অর্জনের সুযোগ থাকতে পারে।

আল্লাহ বলেন—

إِنَّمَا يُوَفَّى ٱلصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ

“নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে অগণিতভাবে।”

—সূরা আয-যুমার, ৩৯:১০

তবে এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ভারসাম্য রয়েছে।

আমরা কোনো নির্দিষ্ট বিপদ দেখে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না—“আল্লাহ এই বিপদ দিয়েছেন শুধু আমার মর্যাদা বাড়ানোর জন্য।”

কোনো বিপদ গুনাহ মোচনের কারণ হতে পারে, কোনোটি সতর্কবার্তা হতে পারে, কোনোটি আমাদের নিজেদের কাজের পরিণতি হতে পারে, আবার কোনোটি মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম হতে পারে। কখনো একই পরীক্ষার মধ্যেই একাধিক হিকমাহ থাকতে পারে।

এর প্রকৃত কারণ আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।

কিন্তু একজন মুমিন একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে জানে—আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা তার সবর কখনোই বৃথা যাবে না।

তাই “আমার জীবনেই আবার বিপদ কেন?”—এর পরিবর্তে নিজের কাছে আরেকটি প্রশ্ন রাখা যায়—

এই নতুন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আর কী সুযোগ আমার সামনে এসেছে?

কষ্ট মানেই আল্লাহ আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন—এমন নয়

দুনিয়ার কষ্ট সম্পর্কে কুরআন কোনো অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

আল্লাহ আগেই জানিয়ে দিয়েছেন—

وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ

“আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে; আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।”

—সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫

ঈমান আনলেই জীবনে আর কোনো কষ্ট থাকবে না—ইসলাম এমন কথা বলে না।

বরং কষ্টের মধ্যেও একজন মানুষ কীভাবে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে, সেটিও তার পরীক্ষার অংশ।

আজকের একটি কঠিন পরীক্ষা হয়তো আমাকে আরও বেশি দোয়া করতে শেখাচ্ছে। কোনো ক্ষতি হয়তো দুনিয়ার প্রতি আমার অতিরিক্ত আসক্তি কমিয়ে দিচ্ছে। কোনো দীর্ঘ অপেক্ষা হয়তো আমাকে সবর শেখাচ্ছে।

তাই বিপদ এলে শুধু—

“কেন আমার সাথে এমন হলো?”

এই প্রশ্নেই আটকে না থেকে একজন মুমিন আরেকটি প্রশ্নও করতে পারে—

“এই পরিস্থিতিতে আল্লাহ আমার কাছ থেকে কী ধরনের আচরণ চান?”

এই প্রশ্নটি অনেক সময় বিপদকে দেখার পুরো দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দেয়।

মানুষ কি সত্যিই ‘সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ’?

আমাদের সমাজে প্রায়ই বলা হয়, মানুষ “আশরাফুল মাখলুকাত”—সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা ভালো। “আশরাফুল মাখলুকাত” এই নির্দিষ্ট বাক্যটি কুরআনের কোনো আয়াত নয়।

কুরআন অবশ্য মানুষকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার কথা বলেছে।

আল্লাহ বলেন—

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ

“নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দিয়েছি…”

—সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭০

মানুষকে বুদ্ধি দেওয়া হয়েছে, বিবেক দেওয়া হয়েছে, সত্য-মিথ্যা বোঝার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু মর্যাদার সাথে দায়িত্বও আসে।

মানুষ এই ক্ষমতাগুলো সত্য অনুসন্ধানে ব্যবহার করতে পারে, আবার নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণেও নষ্ট করতে পারে।

তাই শুধু মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়াই সফলতা নয়। আমাকে যে বুদ্ধি, স্বাধীনতা এবং সুযোগ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো আমি কীভাবে ব্যবহার করছি—সেটিই আসল প্রশ্ন।

আল্লাহর কি আমাদের ইবাদতের প্রয়োজন আছে?

যখন বলা হয় মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তখন কারও মনে প্রশ্ন আসতে পারে—আল্লাহর কি তাহলে আমাদের ইবাদতের প্রয়োজন রয়েছে?

কুরআনের উত্তর পরিষ্কার।

আল্লাহ বলেন—

يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ ۖ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ

“হে মানুষ! তোমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী, আর আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত।”

—সূরা ফাতির, ৩৫:১৫

আমাদের নামাজ আল্লাহর ক্ষমতা বৃদ্ধি করে না। আমাদের ইবাদত না করলে তাঁর রাজত্বের কোনো ক্ষতি হয় না।

বরং আমরাই তাঁর মুখাপেক্ষী।

ইবাদত আমাদের স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক তৈরি করে। ইবাদত আমাদের অহংকার ভাঙে। ইবাদত মনে করিয়ে দেয়—আমি নিজের মালিক নই। আমার জীবন, আমার সময়, আমার সামর্থ্য—সবকিছুরই একজন দাতা আছেন।

তাই আল্লাহর ইবাদতের প্রয়োজন আল্লাহর নয়—প্রয়োজন আমাদের।

তাহলে জীবনের উদ্দেশ্য কী?

সব আলোচনা শেষে বিষয়টি আবার খুব সহজ হয়ে আসে।

আমরা উদ্দেশ্যহীনভাবে পৃথিবীতে আসিনি।

আমাদের একজন স্রষ্টা আছেন।

তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য।

এই দুনিয়াকে করেছেন পরীক্ষার স্থান।

আমাদের সামনে সত্য ও মিথ্যার পথ তুলে ধরেছেন।

চিন্তা করার ক্ষমতা দিয়েছেন।

নির্বাচন করার সুযোগ দিয়েছেন।

পরীক্ষা দিয়েছেন এবং সেই পরীক্ষার মধ্যেই সবর, তাওয়াক্কুল, তওবা ও উত্তম আমলের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য এবং আখিরাতের উচ্চ মর্যাদা অর্জনের সুযোগ রেখেছেন।

আর একদিন এই সুযোগের সময় শেষ হবে।

তখন প্রশ্ন হবে না—আপনি কত বড় বাড়ির মালিক ছিলেন, আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কত টাকা ছিল কিংবা পৃথিবীতে কত মানুষ আপনাকে চিনত।

গুরুত্বপূর্ণ হবে—আপনাকে যে জীবন দেওয়া হয়েছিল, সেটি আপনি কীভাবে ব্যবহার করেছিলেন।

শেষ কথা

একটি পাহাড় নিজের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করে না।

সূর্য তার কক্ষপথের অর্থ জানতে চায় না।

একটি সাধারণ কম্পিউটার প্রোগ্রাম তার নির্মাতাকে খুঁজতে বের হয় না।

কিন্তু মানুষ পারে।

মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করতে পারে—

“এই বিশাল সৃষ্টি কেন?”

তারপর নিজের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করতে পারে—

“আমি কেন?”

হয়তো এই প্রশ্ন করার ক্ষমতাটিও আমাদের পরীক্ষার একটি অংশ।

তবে কুরআন আমাদের প্রশ্নের উত্তরহীন রেখে দেয়নি।

মানুষ কেন সৃষ্টি?

আল্লাহর ইবাদতের জন্য।

দুনিয়ার জীবন কেন?

পরীক্ষার জন্য—কে কাজে উত্তম তা প্রকাশের জন্য।

জীবনে বারবার পরীক্ষা কেন আসতে পারে?

কারণ প্রতিটি পরীক্ষা নতুনভাবে সবর, ঈমান, তাওয়াক্কুল ও উত্তম আমলের সুযোগ তৈরি করতে পারে। কোনো কোনো পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার গুনাহ মোচন করেন, আবার কোনো পরীক্ষার মাধ্যমে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষার পেছনে আল্লাহর নির্দিষ্ট হিকমাহ আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না।

আমাদের করণীয় কী?

স্রষ্টাকে চেনা, তাঁর দেওয়া পথনির্দেশ অনুসরণ করা এবং আমাদের দেওয়া স্বাধীনতাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা।

তাই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি শুধু—

“আমি কেন সৃষ্টি হয়েছি?”

নয়।

এর পরের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ—

যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর দেওয়া এই জীবন এবং এই পরীক্ষাগুলো নিয়ে আমি কী করছি?

ফেসবুকে যারা মন্তব্য করেছেনঃ
(Visited 1 times, 1 visits today)