ধৈর্য বা সবর ইসলামের একটি মৌলিক গুণ, যা মুমিনের ঈমানকে পরিপুষ্ট করে। এটি শুধু কষ্ট সহ্য করার নাম নয়, বরং আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা এবং প্রতিটি পরিস্থিতিতে তাঁর উপর ভরসা রাখা। ধৈর্য একজন মুমিনকে দুনিয়ার অস্থিরতা থেকে রক্ষা করে আখিরাতের সফলতার পথে এগিয়ে নেয়।

ধৈর্য কী?

ধৈর্য (Sabr) মানে হলো—আত্মসংযম, সহনশীলতা, কষ্ট ও বিপদের সময়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নাফরমানি না করা এবং ইতিবাচক আচরণ বজায় রাখা।

কেন ধৈর্য গুরুত্বপূর্ণ?

ধৈর্য দুনিয়াতে আমাদের শান্তি ও আত্মিক দৃঢ়তা প্রদান করে এবং আখিরাতে আমাদের জন্য জান্নাতের পথ প্রশস্ত করে। এটি একজন মুসলিমের ঈমানের অংশ, যা তাকে বিপদের মধ্যেও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে অটল রাখে।

ইসলামে ধৈর্যের স্থান:

কুরআন ও হাদীস উভয়েই ধৈর্যের গুরুত্ব অপরিসীমভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ধৈর্য শুধু কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা নয়, বরং তা হচ্ছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রেখে জীবন পরিচালনা করা।

ধৈর্যের প্রকারভেদ

আল্লাহর আদেশ পালনে ধৈর্য

নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি ইবাদতে অবিচল থাকা, শরীয়তের বিধান পালনে ধৈর্য ধরা।

গুনাহ থেকে বিরত থাকতে ধৈর্য

শয়তানের ও নফসের প্রলোভনে না পড়ে, হারাম কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা – এটি ধৈর্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক। যেমন: গীবত, ক্রোধ বা হারাম কাজ থেকে নিজেকে সংযত রাখা।

বিপদ-মুসিবতে ধৈর্য

রোগ-ব্যাধি, প্রিয়জনের মৃত্যু, দারিদ্র্য, ব্যবসায়িক ক্ষতি – এসব কষ্টে ধৈর্য ধারণ করাই একজন প্রকৃত মুমিনের পরিচয়।

হাদীসে এসেছে:“মুমিনের অবস্থা আশ্চর্যজনক! সব অবস্থাতেই তার জন্য কল্যাণ। যদি সে সুখ পায়, শুকরিয়া আদায় করে—এটা তার জন্য ভালো। আর যদি কষ্ট পায়, ধৈর্য ধারণ করে—এটাও তার জন্য ভালো।” (সহীহ মুসলিম)


কুরআন ও হাদীসের আলোকে ধৈর্যের সওয়াব

১. আল্লাহর ভালোবাসা ও সাহায্য লাভ

“হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”
— (সূরা বাকারা: ১৫৩)

২. ক্ষমা ও উচ্চ মর্যাদা

“আমি ধৈর্যশীলদেরকে তাদের কৃতকর্মের উত্তম প্রতিদান অবশ্যই দিব।”
— (সূরা নাহল: ৯৬)

৩. বিপদ সহজ হওয়া

“নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি।”
— (সূরা ইনশিরাহ: ৬)

৪. পরীক্ষা ও পুরস্কার

“আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, প্রাণ ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।”
— (সূরা বাকারা: ১৫৫)

৫. অগণিত প্রতিদান

“নিঃসন্দেহে ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে হিসাব ছাড়াই প্রদান করা হবে।”
— (সূরা যুমার: ১০)


ধৈর্যের বাস্তব উদাহরণ

নবী-রাসূলগণের জীবন
  • নবী আইয়ুব (আঃ):
    দীর্ঘকাল অসুস্থতা ও কষ্ট সহ্য করেও তিনি আল্লাহর প্রতি অসন্তুষ্ট হননি। ফলে আল্লাহ তাকে সুস্থতা ও সমৃদ্ধি দান করেন।
  • ইউসুফ (আঃ):
    ভাইদের ষড়যন্ত্র, কারাগারের কষ্ট এবং প্রলোভনেও তিনি ধৈর্য ধরে আল্লাহর প্রতি আস্থা রেখেছিলেন।
  • রাসূলুল্লাহ (ﷺ):
    তায়েফবাসীর নির্মম আচরণ, মক্কার নির্যাতন—সবকিছুতে তিনি ধৈর্য ধারণ করেছিলেন।

সাধারণ মানুষের জীবনে ধৈর্য

আজকের দিনে অসুস্থতা, অর্থনৈতিক কষ্ট, পারিবারিক কলহ—এসব পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলে তা আলোর পথ খুলে দেয়।


কীভাবে ধৈর্য অনুশীলন করবেন?

তাকওয়া বৃদ্ধি করুন

আল্লাহর ভয় ও তাঁর প্রতি বিশ্বাস আমাদের ধৈর্যশীল হতে সহায়তা করে।

দোয়া ও যিকির করুন

বিপদের সময় “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” বলা এবং আল্লাহর নামের যিকির ধৈর্যকে মজবুত করে।

বিশ্বাস রাখুন, তিনি আপনার সবরকে বৃথা যেতে দেবেন না।

  • দোয়া ও যিকির:
    • “رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا”
      (হে আমাদের রব! আমাদের উপর ধৈর্য বর্ষণ করুন।)
হতাশা নয়, আশাবাদী হন

আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে হতাশ হবেন না। তিনি বলেন:

“আল্লাহর রহমত থেকে কেউ নিরাশ হয় না।”
— (সূরা ইউসুফ: ৮৭)

ছোট ছোট বিষয়ে ধৈর্য চর্চা করুন

রাস্তায় যানজটে, বাড়িতে ঝগড়া, অথবা চাকরিতে চাপ—এইসব দৈনন্দিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য অনুশীলন করুন।

ধৈর্যের সুফল মনে রাখুন

ধৈর্যের বিনিময়ে জান্নাত ও আল্লাহর ভালোবাসা—এ কথা মনে রেখে নিজেকে প্রশান্ত রাখুন।

ধৈর্য শুধু একটি গুণ নয়, এটি একজন মুমিনের জীবনের মূল স্তম্ভ। দুনিয়ার প্রতিটি কষ্টই আল্লাহর পক্ষ থেকে এক পরীক্ষা, আর ধৈর্য সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মূল চাবিকাঠি। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করতে পারে, সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই সফলতা লাভ করে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দান করুন এবং বিপদের সময়ে নিজেকে তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ করে দিন। আমিন।

📌 আপনার জীবনের কোন মুহূর্তে সবর আপনাকে শক্তি যুগিয়েছে? কমেন্টে শেয়ার করুন!

এই ব্লগ পোস্টটি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে অন্যকেও উপকৃত হতে সহায়তা করুন। 💚

ফেসবুকে যারা মন্তব্য করেছেনঃ
(Visited 30 times, 1 visits today)