দাম্পত্য জীবন মানেই শুধু প্রেম আর রোমান্স নয়। এটি একটি যৌথ পথচলা, যেখানে ছোটখাটো মতভেদ, অর্থনৈতিক চাপ, বা আত্মীয়-স্বজনের হস্তক্ষেপ থেকে কলহ সৃষ্টি হতে পারে। অনেক দম্পতি এই সমস্যাগুলো লোকলজ্জার ভয়ে লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু জেনে রাখুন, ইসলাম কলহ ঢেকে রাখা নয়, বরং ন্যায় ও ধৈর্যের পথে তা সমাধান করতে শিখিয়েছে।

সমস্যা যখন সমাধান না হয়ে জমে ওঠে, তখন তা কেবল সংসারকেই নয়, আপনার মানসিক শান্তি এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়।


সম্পর্কের সীমানা ও আত্মীয়ের হস্তক্ষেপ

আত্মীয়তা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, কিন্তু অতিরিক্ত বা অযাচিত হস্তক্ষেপ দাম্পত্য কলহের অন্যতম প্রধান কারণ। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো একান্তই তাদের হওয়া উচিত।

  • শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সম্পর্ক: শ্বশুর-শাশুড়িকে সম্মান করা অপরিহার্য। তবে স্ত্রীকে তাদের সাথে একই ঘরে থাকতে বাধ্য করা যাবে না, যদি এতে দাম্পত্য শান্তি নষ্ট হয় বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়। ভালো ব্যবহার বজায় রেখে আলাদা ঘরে থাকা শরয়ী দিক থেকেও বৈধ। সীমারেখা মানা জরুরি।
  • দায়িত্বের প্রশ্ন: মনে রাখবেন, “প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি তার দায়িত্বাধীনদের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হবে।” (সহিহ হাদিস – বুখারি, মুসলিম)। স্বামী ও স্ত্রী, উভয়েই তাদের সম্পর্কের প্রধান দায়িত্বশীল।

“মানুষ কী বলবে” – এই ভয় কখন ভাঙবেন?

“মানুষ কী বলবে”—এই লোকলজ্জার ভয়ে সমস্যা গোপন করে রাখলে তা জমতে জমতে একসময় বিরাট ভাঙনের কারণ হয়। ইসলাম হকের জায়গায় লোকলজ্জা দেখতে বলে না।

  • সাহায্য নিন: সমস্যা যখন নিজেদের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব না হয়, তখন বিশ্বস্ত আলেম, অভিজ্ঞ পারিবারিক কাউন্সেলর বা সালিশের কাছে সাহায্য নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
  • ইসলামের নির্দেশনা: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: “আল্লাহর অবাধ্যতায় কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই।” (সহিহ হাদিস)। আপনার হক বা ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে সাহায্য নিতে পিছপা হবেন না।

নির্যাতনের বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান

শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন ইসলাম কোনোভাবেই অনুমোদন করে না। কুরআন স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেয়: “তোমরা তাদের সাথে সদাচরণ করো।” (সূরা নিসা: ১৯)

নির্যাতনের শিকার হলে স্বামী বা স্ত্রী—উভয়েরই উচিত নীরব না থেকে ন্যায্য সমাধান খোঁজা। প্রমাণ সংরক্ষণ করা, আলেম বা আইনগত সহায়তা নেওয়া—যা প্রয়োজন, তা করা উচিত। জুলুম সহ্য করা কোনো ধর্মীয় গুণ নয়, বরং তা আরও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।


অর্থনৈতিক কলহ: ঐক্য ও বরকতের পথ

অর্থনৈতিক টানাপোড়েন প্রায় প্রতিটি সংসারে একটি প্রধান কলহের কারণ। এই সংকট সামলাতে ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী বাস্তব পদক্ষেপ নিন:

  • হালাল উপার্জন ও বাজেট: হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা, বাস্তবসম্মত বাজেট তৈরি করা এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো
  • কৃতজ্ঞতা ও দোয়া: যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। অর্থ সংকট থাকলেও যদি ঐক্য ও ধৈর্য থাকে, তবে সংসারে বরকত আসে

ঝগড়া মেটানোর জন্য কোরআনের সালিশ পদ্ধতি

যখন দাম্পত্য কলহ নিজেদের মধ্যে সমাধান করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, তখন কোরআন সালিশের নির্দেশনা দিয়েছে:

“যদি তোমরা তাদের মধ্যে কলহের আশঙ্কা কর, তবে একজন সালিশ নিয়োগ কর পুরুষের পরিবার থেকে এবং একজন সালিশ নিয়োগ কর নারীর পরিবার থেকে। তারা যদি মীমাংসা করতে চায়, আল্লাহ তাদের মধ্যে মিল ঘটিয়ে দেবেন।” (সূরা নিসা: ৩৫)

অতএব, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে দ্রুত সালিশ বা কাউন্সেলিং নেওয়া জরুরি।

দাম্পত্য শান্তি ফেরাতে কিছু সহজ অভ্যাস:

  • অপমান নয়, সম্মান: ঝগড়ার সময় অপমানজনক ভাষা ব্যবহার না করা এবং পুরনো অভিযোগ টেনে না আনা।
  • বিরতি নিন: সমস্যা বাড়লে একটু বিরতি নিন এবং মাথা ঠান্ডা করে কথা বলুন।
  • বিশ্বাস বাড়ান: স্বচ্ছতা বজায় রাখুন এবং প্রতিশ্রুতি পূরণ করুন। গোপনে কিছু না রেখে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেয়ার করুন।
  • দোয়া ও আমল: নিয়মিত এই কোরআনের দোয়াটি পড়ুন: “হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা বানাও এবং আমাদের মুত্তাকীদের নেতা বানাও।” (সূরা ফুরকান: ৭৪)

দাম্পত্য কলহ জীবনের অংশ। কিন্তু ইসলাম শিখিয়েছে—ন্যায়বিচার, সম্মান, ধৈর্য ও সালিশের মাধ্যমে তা সমাধান করতে। সমস্যাকে লুকিয়ে রাখা সমাধান নয়; বরং সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

❓ দাম্পত্য কলহ ও সামাজিক সমস্যা – সাধারণ জিজ্ঞাসা

স্ত্রী অবাধ্য হলে স্বামীর করণীয় কী?

প্রথমে নরমভাবে উপদেশ দিন, পরে সাময়িকভাবে পৃথক কক্ষে থাকুন। প্রয়োজনে ন্যায়সঙ্গত সালিশ করুন। নির্যাতন বা অপমান ইসলামে নিষিদ্ধ।

স্বামী যদি জুলুম করে তবে স্ত্রীর করণীয় কী?

নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করুন, বিশ্বস্ত আলেম, পরিবার বা আইনগত সহায়তা নিন। প্রয়োজনে খুলআ বা বিচারিক সমাধান চাইতে পারেন।

শ্বশুরবাড়ির ঝগড়া মিটমাট করার উপায় কী?

সম্মান রেখে সীমা নির্ধারণ, দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং উভয় পক্ষের ন্যায়পরায়ণ মধ্যস্থতা।

দাম্পত্য কলহ এড়ানোর কুরআনিক দিকনির্দেশনা কী?

সদাচরণ, ক্ষমাশীলতা, সালিশ, সংযম এবং শান্তিপূর্ণ আলাপ—এসব নির্দেশ কুরআনে এসেছে।

স্ত্রীর সাথে খারাপ ব্যবহার করলে কী গুনাহ হয়?

স্ত্রীকে নির্যাতন করা হারাম। রাসূল ﷺ বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর সাথে উত্তম আচরণ করে।”

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতভেদ হলে ইসলাম কী সমাধান দিয়েছে?

সংলাপ, সময় নেওয়া, ন্যায়সঙ্গত সালিশ এবং দোয়া—এসব ইসলামের প্রদত্ত সমাধান।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আস্থা ও সম্মান কিভাবে বাড়ানো যায়?

স্বচ্ছতা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, গোপন বিষয় শেয়ার, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং একসাথে ইবাদত করা।

যৌতুক ইসলাম অনুযায়ী জায়েয কি?

না। যৌতুক চাপিয়ে নেওয়া হারাম। ইসলামে দেনমোহর হলো স্ত্রীর অধিকার।

অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে দাম্পত্য জীবনে কলহ হলে কী করা উচিত?

হালাল উপার্জন, বাজেট তৈরি, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো, ধৈর্য ও দোয়া করা জরুরি।

আত্মীয়স্বজনের হস্তক্ষেপে সংসারে ঝামেলা হলে করণীয় কী?

সম্মান রেখে সীমা টানতে হবে; প্রয়োজনে উভয় পক্ষের বিশ্বস্ত সালিশ করতে হবে।

স্ত্রীকে কাজ করতে দেওয়া ইসলামে অনুমোদিত কি না?

হালাল উপার্জন হলে, পর্দা ও দায়িত্ব ব্যাহত না হলে অনুমোদিত। তবে স্বামী–স্ত্রীর পারস্পরিক সমঝোতা জরুরি।




প্রশ্ন: আপনার দাম্পত্য জীবনে ঝগড়া এড়াতে আপনার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল কোনটি?

ফেসবুকে যারা মন্তব্য করেছেনঃ
(Visited 9 times, 1 visits today)