মানুষের জীবনে হতাশা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ (স্ট্রেস)—এই বিষয়গুলো অত্যন্ত স্বাভাবিক। বিশ্বখ্যাত ইসলামিক বক্তা মুফতি ইসমাইল মেনক তাঁর মালদ্বীপের বক্তৃতায় কীভাবে ইসলামের বিধান ও আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাস আমাদের এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
আমরা সবাই জীবনের কোনো না কোনো মুহূর্তে একটা কঠিন মানসিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাই। আমাদের মন খারাপ হয়, আমাদের দুশ্চিন্তা হয়, আমরা বিছানা ছেড়ে উঠতে চাই না—আমাদের মনে হয়, বুঝি সব আশা শেষ।
কিন্তু যখনই কোনো মুসলিম ভাই বা বোন হতাশা বা উদ্বেগের কথা বলেন, তখনই সমাজের একটা বড় অংশ এক নির্মম প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—“তোমার ঈমান কি দুর্বল হয়ে গেছে?”
মুফতি ইসমাইল মেনক এই প্রচলিত ভুল ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। আসুন, সত্যটা জানি।
আপনার মানসিক যন্ত্রণা, দুর্বল ঈমানের পরিচয় নয়
আপনারা কি মনে করেন, কোনো ব্যক্তি বিষণ্ণ হলে বা মানসিক কষ্টে ভুগলে সে দুর্বল ঈমানদার হয়ে যায়? কখনোই নয়!
এই যুগে এই ভুল ধারণাটি সমাজে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে, মানুষ সাহায্য চাইতে ভয় পায়। মুফতি মেনক স্পষ্ট বলেছেন, হতাশা বা উদ্বেগ জীবনের স্বাভাবিক অংশ। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আর তিনিই ভালো জানেন মানবজাতির এই মানসিক অবস্থাগুলোর কথা।
আপনার ঈমান আপনাকে সুরক্ষা দেবে—এটি আপনার আত্মিক ঢাল—যা আপনাকে কঠিন সময়ে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু কষ্ট আসা, পরীক্ষা আসা, মন ভার হওয়া—এটা সবার জীবনেই আসে। তাই কাউকে দুর্বল না বলে বরং তার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া কি আমাদের কর্তব্য নয়?
কেন আপনি রাতে ঘুমান না? আল্লাহর দেওয়া ‘সিস্টেম’ ভাঙছেন না তো?
আল্লাহ আমাদের জন্য একটি নিখুঁত সিস্টেম তৈরি করেছেন—রাতকে করেছেন বিশ্রামের জন্য, আর দিনকে করেছেন কাজের জন্য। কিন্তু আমরা কী করি?
এশার নামাজের পর আমাদের যদি গঠনমূলক কিছু করার না থাকে, তবে আমাদের কী করা উচিত? ঘুমানো উচিত! কিন্তু আমরা রাত জাগি, স্ক্রল করি, বা অর্থহীন কাজে ডুবে থাকি।
মুফতি মেনক বলছেন, “আপনি যদি স্বাস্থ্যকর না খান এবং পর্যাপ্ত না ঘুমান, তবে আপনার আত্মিক সিস্টেম দুর্বল হয়ে যাবে।”
ঘুম হলো আল্লাহর দেওয়া এক নিরাময়। আপনি যখন এই সিস্টেমকে অবজ্ঞা করেন, তখন আপনার মানসিকতা দুর্বল হয়ে যায়। তখন সামান্য উদ্বেগও পাহাড়ের মতো মনে হতে শুরু করে। তাই, আপনার মানসিক দুর্বলতার জন্য আপনার ঘুমের অভাব দায়ী, নাকি আপনার ঈমান? চিন্তা করুন!
আপনার আত্মিক ঢাল: প্রিয় নবীর (সাঃ) দু’আ
আপনার জীবনে যতগুলো মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক সমস্যা আসতে পারে, তার সবগুলোর জন্য রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একটি মাত্র দু’আতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন।
“আল্লাহুম্মা ইন্নি আ’উযুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুযনি, ওয়াল ‘আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়াল বুখলি ওয়াল জুবনি, ওয়া দ্বালা’ইদ দাইনি ওয়া গালাবাতীর রিজাল।”
(হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই—)
- উদ্বেগ (আল-হাম্মি) ও দুঃখ (আল-হুযনি) থেকে।
- অক্ষমতা (আল-‘আজযি) ও অলসতা (আল-কাসালি) থেকে।
- কৃপণতা (আল-বুখলি) ও কাপুরুষতা (আল-জুবনি) থেকে।
- এবং ঋণের বোঝা (দ্বালা’ইদ দাইনি) ও মানুষের দ্বারা পরাভূত হওয়া (গালাবাতীর রিজাল) থেকে।
এই দু’আর শব্দগুলো দেখুন:
“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই—উদ্বেগ (আল-হাম্মি) ও দুঃখ (আল-হুযনি) থেকে…”
সুবহানাল্লাহ! প্রিয় নবী (সাঃ) কি শুধু মানসিক কষ্ট থেকে আশ্রয় চেয়ে থেমে গিয়েছিলেন? না! তিনি আরও চেয়েছেন:
“…অক্ষমতা (আল-‘আজযি) ও অলসতা (আল-কাসালি) থেকে।”
এখানেই রয়েছে মূল শিক্ষা: আপনি যখন অলসতা ও অক্ষমতাকে ত্যাগ করে পরিশ্রমী হবেন, তখন আপনার মন নেতিবাচক চিন্তা করার সুযোগ কম পাবে।
আপনি যদি দুশ্চিন্তা করেন, তার মানে আপনি আপনার ভবিষ্যতের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় পাচ্ছেন। কিন্তু মুফতি মেনক মনে করিয়ে দিয়েছেন, তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর চূড়ান্ত ভরসা) হলো আপনার চূড়ান্ত সমাধান। নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করুন, আর বাকিটা তাঁর হাতে ছেড়ে দিন।
আপনার সন্তানেরা কি আপনার কাছে কথা বলার সাহস পায়?
পিতা-মাতা হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কী? একটি কান দেওয়া! আপনার সন্তানের কথা শোনার জন্য একটি কান!
মুফতি মেনক বাবা-মায়েদের কঠোর সতর্ক করেছেন—অনেক শিশু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়, কারণ তারা মনে করে তাদের বাবা-মা তাদের গুরুত্ব দেন না। তাদের ছোট ছোট সমস্যা বা প্রশ্নগুলোকে ধমক দিয়ে উড়িয়ে দেবেন না। তাদের সঙ্গে মানসম্পন্ন সময় কাটান।
যদি বাবা-মায়েদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ না পায়, তবে শিশুরা হতাশায় ডুবে যায় বা ভুল পথে পা বাড়ায়। আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার প্রতি এই পবিত্র দায়িত্ব—আপনার সন্তানকে শুধু খাওয়ানো বা পড়ানো নয়, বরং তাকে মানসিক সমর্থন দেওয়া।
ভিন্নমত পোষণকারীকে সম্মান দেখাতে শিখুন
এই যুগে আমাদের সবচেয়ে বড় পতন কীসে জানেন? আমরা যারা আমাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে, তাদের সম্মান করি না।
মুফতি মেনক জোর দিয়ে বলেছেন: “আমরা যথেষ্ট পরিপক্ব হইনি এই পার্থক্যটা বুঝতে যে—আপনার সঙ্গে একমত হওয়া এবং আপনাকে সম্মান করা এক জিনিস নয়।”
আপনি কারো মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন, কিন্তু তাকে অপমান করবেন না। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবেন না। যখন আমরা একে অপরের প্রতি সম্মান হারাই, তখন সমাজ ও মনের শান্তি—দুটোই ভেঙে পড়ে।
এই সবগুলো সমস্যার সমাধান একটাই: আল্লাহর জিকির (স্মরণ)।
“যারা ঈমান আনে, আল্লাহর স্মরণে তাদের অন্তর প্রশান্ত হয়। জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (সূরা রাদ, ১৩:২৮)।
এখন সিদ্ধান্ত আপনার। আপনি কি নিজের আত্মাকে আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে শক্তিশালী করবেন, নাকি দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী বিনোদনে ডুবে থেকে নিজের মানসিকতাকে দুর্বল করে ফেলবেন?
