দাম্পত্য জীবন—আল্লাহর এক অমূল্য নেয়ামত। এটি কেবল দুজন মানুষের মিলন নয়, বরং একে অপরের জন্য দায়িত্বশীল অভিভাবক হয়ে ওঠার এক পবিত্র অঙ্গীকার। ইসলামে এই সম্পর্ককে অত্যন্ত সুন্দরভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে:
“তারা তোমাদের জন্য পোশাক, আর তোমরা তাদের জন্য পোশাক।” (সূরা বাকারা: ১৮৭)
পোশাক যেমন আমাদের আবৃত করে, রক্ষা করে এবং শান্তি দেয়; তেমনি স্বামী-স্ত্রী দুজনেই দুজনকে ঢেকে রাখবে, নিরাপত্তা দেবে এবং হৃদয়ে প্রশান্তি নিয়ে আসবে। কিন্তু এই শান্তি কি কেবল ভালোবাসার ওপর নির্ভর করে? না। এই সম্পর্ককে স্থিতিশীল ও মজবুত রাখার জন্য প্রয়োজন হক বা অধিকার আদায় এবং স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন।
এই পর্বে আমরা বিস্তারিত জানবো—স্ত্রীর মৌলিক হক, স্বামীর দায়িত্ব, সম্পদের অধিকার, দেনমোহরের গুরুত্ব, অভিমান দূর করার উপায় এবং দাম্পত্য ভালোবাসা টিকিয়ে রাখার পথ।
স্ত্রীর মৌলিক অধিকার: যা স্বামীর জন্য অপরিহার্য
ইসলাম স্ত্রীর জন্য কিছু মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে, যা স্বামীর ওপর ফরজ। এই অধিকারগুলো শুধু সামাজিক সৌজন্যতা নয়, বরং শরয়ী বাধ্যবাধকতা।
আলাদা বাসস্থান ও নিরাপত্তা
স্ত্রীর প্রথম ও প্রধান হক হলো আলাদা বাসস্থান। এর অর্থ হলো—স্ত্রীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদা বজায় রাখার জন্য তাকে শ্বশুর-শাশুড়ি বা অন্যান্য আত্মীয়দের সাথে একই ঘরে থাকতে বাধ্য করা যাবে না। দাম্পত্য জীবনের জন্য ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (প্রাইভেসি) অপরিহার্য। যৌথ পরিবারে অনেক সময় এতে ব্যাঘাত ঘটে, যা অশান্তি বাড়ায়। তাই আলাদা ঘর দেওয়া শুধু সামাজিক প্রয়োজন নয়, বরং এটি স্ত্রীর শরয়ী হক।
তবে স্বামী তার সাধ্যের বাইরে বিলাসিতা দিতে বাধ্য নন। আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ কোনো প্রাণীকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” (সূরা বাকারা: ২৮৬) তাই ছোট বাসা হলেও যদি সেখানে শান্তি থাকে, তবে সেটিই যথেষ্ট।
ভরণ-পোষণ ও সম্মান
এরপর আসে ভরণ-পোষণ—খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা এবং আশ্রয় নিশ্চিত করা। এগুলো সম্পূর্ণরূপে স্বামীর দায়িত্ব।
পাশাপাশি, স্ত্রীর প্রতি উত্তম আচরণ করাও তার হক। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর সাথে সর্বোত্তম আচরণ করে।” (তিরমিজি) স্বামী যদি স্ত্রীকে ভালোবাসা ও সম্মান দেন, সেটাই স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার।
দেনমোহর: সম্মান ও নিরাপত্তার প্রতীক
দেনমোহর কেবল একটি প্রথা নয়, এটি ইসলামে স্ত্রীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। আল্লাহ বলেন: “আর তোমরা নারীদের দেনমোহর স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাও।” (সূরা নিসা: ৪)
দেনমোহর সম্মান ও নিরাপত্তার প্রতীক। এটি স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পদ, যার ওপর তার পূর্ণ অধিকার। দেনমোহর না দেওয়া বা তা পরিশোধে গড়িমসি করা গুনাহের কাজ।
স্ত্রীর সম্পদ: কার অধিকার?
স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পদ (দেনমোহর, উপহার, উত্তরাধিকার) তারই মালিকানাধীন। স্বামী কেবল তার অনুমতিতে তা ব্যবহার করতে পারবেন। স্ত্রী যদি নিজের আয় থেকে সংসারে সাহায্য করেন, সেটা তার ইচ্ছাধীন ও সওয়াবের কাজ; স্বামী জোর করে তা নিতে পারবেন না।
দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চাবিকাঠি
ভালোবাসা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন দুজনের প্রচেষ্টা এবং কিছু সুন্দর অভ্যাস।
- ভুল ক্ষমা করা: একে অপরের ছোটখাটো ভুল ক্ষমা করে দিন।
- কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: ছোট ছোট কাজের জন্য ধন্যবাদ দিন।
- মিষ্টি কথা: প্রিয়জনকে সুন্দর ও মিষ্টি কথা বলুন।
- উপহার: ছোট ছোট উপহার দিন, যা সম্পর্ককে সতেজ রাখবে।
- একসাথে ইবাদত: ইবাদতে একে অপরের সঙ্গী হন, যা সম্পর্কে বরকত আনবে।
যদি স্ত্রী মান-অভিমান করেন, স্বামীর উচিত ধৈর্য রাখা এবং স্নেহের সাথে বোঝানো, রাগ করা বা গালি-গালাজ করা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর স্ত্রীদের সাথে অত্যন্ত ধৈর্যশীল ছিলেন।
যদি স্বামী কর্মসূত্রে দূরে থাকেন, স্ত্রীর কর্তব্য হলো—তার সম্মান, সম্পদ ও পরিবার রক্ষা করা। কুরআনে বলা হয়েছে: “সৎ নারী হলো তারা, যারা অনুপস্থিতিতে স্বামী যা চাই, তা আল্লাহর হেফাজতে রক্ষা করে।” (সূরা নিসা: ৩৪)
হক ও দায়িত্ব পালনে গাফিলতির ফল
স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্ব পালনে গাফিলতি হলে শান্তি ভেঙে যায়।
| স্বামীর দায়িত্ব (স্ত্রীর হক) | স্ত্রীর দায়িত্ব (স্বামীর হক) |
| ১. আলাদা বাসস্থান দেওয়া | ১. তার প্রতি আনুগত্য (যেখানে আল্লাহর অবাধ্যতা নেই) |
| ২. ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা | ২. স্বামীর সম্মান রক্ষা করা |
| ৩. সম্মান ও নিরাপত্তা দেওয়া | ৩. স্বামীর সম্পদ ও পরিবার রক্ষা করা |
| ৪. দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখা | ৪. স্বামীকে সম্মান ও ভালোবাসা দেওয়া |
| ৫. ভালোবাসা ও ন্যায্য ব্যবহার করা | (সম্পদের মালিকানা ও অধিকারের ক্ষেত্রে কোনো আনুগত্য নেই) |
যদি স্বামী স্ত্রীর হক আদায় না করেন, তিনি গুনাহগার হবেন। একইভাবে, স্ত্রী স্বামীকে যথাযথ সম্মান না দিলে তিনিও দায়ী। সুখী ও জান্নাতের মতো পরিবার চাইলে, দুজনকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে দুজনেরই দায়িত্ব নিতে হবে।
❓ স্বামী–স্ত্রীর অধিকার ও দায়িত্ব – সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিয়ের পর ছেলে-মেয়েকে পৃথক সংসার করা কেন জরুরি?
দাম্পত্য শান্তি, গোপনীয়তা ও দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা আসে; যৌথ কলহ কমে।
স্ত্রীকে কি শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে থাকতে বাধ্য করা যাবে?
না। স্ত্রীকে আলাদা নিরাপদ বাসস্থান দেওয়া স্বামীর শরয়ী দায়িত্ব।
যদি বাবা-মা আলাদা ঘর না চান কিন্তু স্ত্রী চান, তখন স্বামীর করণীয় কী?
স্ত্রীর হককে অগ্রাধিকার দিয়ে আলাদা ঘর নিশ্চিত করুন; সাথে বাবা-মায়ের সেবা অব্যাহত রাখুন।
আলাদা সংসার করলে কি বাবা-মায়ের হক নষ্ট হয়?
না। দেখা-শোনা, খরচে সহযোগিতা, দোয়া ও সম্মান—এসব আলাদা থেকেও করা যায়।
সামাজিক ভয় বা লোকলজ্জার কারণে অনেকে আলাদা হতে চান না – ইসলাম এ বিষয়ে কী বলে?
হকের জায়গায় লোকলজ্জা গ্রাহ্য নয়; স্ত্রীর অধিকার রক্ষাই অগ্রাধিকার।
স্ত্রীর মৌলিক হকগুলো কী কী?
আলাদা বাসস্থান, ভরণ–পোষণ, পোশাক–চিকিৎসা, নিরাপত্তা, সম্মান ও দাম্পত্য সম্পর্ক।
স্বামীর মৌলিক দায়িত্ব কী?
ভরণ–পোষণ, আলাদা ঘর, ন্যায্য ব্যবহার, সম্মান–ভালোবাসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
যৌথ পরিবারে থেকে শান্তি বজায় রাখার উপায় কী?
ভূমিকা স্পষ্টকরণ, প্রাইভেসি রক্ষা, সম্মানজনক ভাষা, দায়িত্ব বণ্টন ও ন্যায়সঙ্গত সালিশ।
স্ত্রীর জন্য কেমন ঘর দেওয়া স্বামীর ওপর ওয়াজিব?
আলাদা, নিরাপদ, সম্মানজনক বাসস্থান—যেখানে প্রাইভেসি ও ইবাদত বিঘ্নিত না হয়।
স্বামী সামর্থ্যের বাইরে থাকলে কীভাবে স্ত্রীর হক পূরণ করবে?
সামর্থ্য অনুযায়ী ভরণ–পোষণ, অপচয় পরিহার, হালাল উপার্জনে চেষ্টা—সাধ্যের বাইরে চাপ নয়।
সন্তান জন্মের পর আলাদা সংসারের গুরুত্ব কেন বাড়ে?
মা–শিশুর বিশ্রাম, স্বাস্থ্য ও লালন–পালনে শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে।
আলাদা সংসার করলে কি আত্মীয়তার বন্ধন নষ্ট হয়ে যায়?
না। নিয়মিত খোঁজখবর, দেখা–সাক্ষাৎ ও সহায়তায় বন্ধন আরও সুদৃঢ় হতে পারে।
স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি মৌলিক অধিকার কী?
পারস্পরিক সম্মান, দাম্পত্য অধিকার, গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ।
দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মমতা বজায় রাখার উপায় কী?
ভুল ক্ষমা, কৃতজ্ঞতা, ছোট উপহার, মধুর ভাষা, একসাথে ইবাদত ও সময় দেওয়া।
স্ত্রীর ভরণপোষণ কতটা স্বামীর দায়িত্ব?
পূর্ণাঙ্গভাবে স্বামীর দায়িত্ব—খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা, বাসস্থান ও প্রয়োজনীয়তা।
স্ত্রীর শিক্ষা, নিরাপত্তা ও চিকিৎসার দায়িত্ব কার?
স্বামীর দায়িত্বের অংশ—সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
স্বামী স্ত্রীর প্রতি অবহেলা করলে শরীয়তের বিধান কী?
হক নষ্ট করলে গুনাহগার; পরামর্শ–সালিশে সমাধান না হলে শরয়ি/আইনি সহায়তা সম্ভব।
স্ত্রী যদি সংসারের কাজে সাহায্য না করে তবে কী করণীয়?
গৃহকর্ম বাধ্যতামূলক নয়; তবে পারস্পরিক সহযোগিতা সুন্নত—আলাপ করে দায়িত্ব ভাগ করুন।
স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার মূল কারণগুলো কী?
অর্থকষ্ট, আত্মীয়ের হস্তক্ষেপ, ভুল বোঝাবুঝি, অসম্মান ও দুর্বল যোগাযোগ।
ইসলামে দাম্পত্য জীবনে শারীরিক সম্পর্কের গুরুত্ব কতটা?
এটি উভয়ের পারস্পরিক হক; সুস্থ সম্পর্ক, মানসিক প্রশান্তি ও ভালোবাসা বাড়ায়।
স্ত্রীকে আলাদা বাসস্থান না দিলে স্বামী কি গুনাহগার হবে?
হ্যাঁ। আলাদা বাসস্থান স্ত্রীর শরয়ি হক—না দিলে গোনাহ হবে।
স্ত্রীর জন্য দেনমোহর কতটা বাধ্যতামূলক?
বিয়ের সময় নির্ধারিত দেনমোহর পরিশোধ বাধ্যতামূলক; এটি স্ত্রীর অধিকার।
স্ত্রী যদি স্বামীর আয়-রোজগার সামান্য হয় তবে কীভাবে সংসার চলবে?
সাধ্যের মধ্যে ভরণ–পোষণ, বাজেট, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো, ধৈর্য ও দোয়া।
স্বামী কি স্ত্রীর সম্পদ ব্যবহারের অধিকার রাখে?
না। স্ত্রীর সম্পদে পূর্ণ অধিকার স্ত্রীরই; স্বামীর ব্যবহারের জন্য স্ত্রীর অনুমতি প্রয়োজন।
আপনার মতে, দাম্পত্য জীবনে সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব কোনটি? মন্তব্য করে জানান!
