ইসলাম পরিবার ভাঙনকে কোনোভাবেই পছন্দ করে না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্পষ্ট বলেছেন: “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল বস্তু হলো তালাক।” (আবু দাউদ)

তবুও বাস্তব জীবনে এমন কিছু পরিস্থিতি আসে যখন স্বামী-স্ত্রীর পক্ষে একসাথে থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠে। এ ধরনের অসহনীয় সম্পর্ক থেকে মুক্তি দিতেই ইসলাম তালাক (স্বামীর বিচ্ছেদ) এবং খুলআ (স্ত্রীর বিচ্ছেদ আবেদন)—উভয়ের সুযোগ রেখেছে। তবে দুটোই শেষ অবলম্বন—যখন আর কোনো সমাধান বাকি থাকে না।


তালাক কেন বৈধ, তবুও অপছন্দনীয়?

তালাক বৈধ করা হয়েছে যেন অত্যাচার, অবিচার বা চরম মানসিক অসঙ্গতির মতো অসহনীয় সম্পর্ক থেকে মুক্তির পথ থাকে। কিন্তু এটি অপছন্দনীয়, কারণ এর ক্ষতি সুদূরপ্রসারী:

  1. পরিবার ভাঙন: তালাক শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভাঙে না, সন্তানদের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে।
  2. সামাজিক অস্থিরতা: আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল হয় এবং সমাজে অস্থিরতা ছড়ায়।
  3. আর্থিক অনিশ্চয়তা: উভয় পক্ষ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

এই কারণেই তালাককে খেলাচ্ছলে ব্যবহার করা হারাম


তালাক দেওয়ার সঠিক ইসলামিক পদ্ধতি: ‘ইদ্দত’ ও ‘এক তালাক’

ইসলাম তাড়াহুড়ো করে বা রাগের মাথায় তালাক দিতে নিষেধ করেছে। কোরআন তালাক দেওয়ার সঠিক নিয়ম বাতলে দিয়েছে, যা সম্পর্ককে পুনর্মিলনের একটি সুযোগও দেয়:

“তোমরা যখন নারীদের তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তালাক দাও এবং তাদেরকে তাদের ঘর থেকে বের করো না।” (সূরা তালাক: ১)

১. পরিষ্কার ভাষা: তালাক দিতে হবে পরিষ্কার ভাষায়, রাগ বা মদ্যপ অবস্থায় নয়। ২. এক তালাক: সঠিক পদ্ধতি হলো একবার তালাক দেওয়া, এরপর ইদ্দত পর্যন্ত অপেক্ষা করা। ৩. ইদ্দত: এই ইদ্দত চলাকালীন (সাধারণত তিনটি মাসিক চক্র) স্বামী-স্ত্রী একই ঘরে অবস্থান করতে পারে, যাতে তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে। এই সময়ে স্বামী চাইলে তালাক প্রত্যাহার করে নিতে পারেন।

একসাথে তিন তালাক দেওয়া ইসলামে একটি গুরুতর ভুল ও গুনাহের কাজ, যা তাৎক্ষণিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয় এবং আর ফিরিয়ে আনার পথ রাখে না।


খুলআ কী? যখন স্ত্রী বিচ্ছেদ চান

খুলআ হলো স্ত্রীর ন্যায্য বিচ্ছেদ আবেদন। যখন স্ত্রীর পক্ষে স্বামীর সাথে জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন ও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, তখন সে আদালতের মাধ্যমে এই অধিকার প্রয়োগ করতে পারে।

কুরআনে বলা হয়েছে: “যদি তোমরা ভয় কর যে তারা আল্লাহর সীমারেখা বজায় রাখতে পারবে না, তবে স্ত্রী যদি মুক্তির জন্য কিছু ফিরিয়ে দেয়, তবে তাতে কোনো দোষ নেই।” (সূরা বাকারা: ২২৯)

  • পার্থক্য: তালাক স্বামীর হাতে দেওয়া অধিকার, আর খুলআ স্ত্রীর আবেদনমূলক অধিকার।
  • দেনমোহর: তালাকে স্ত্রী দেনমোহরের পূর্ণ অধিকারী থাকে, কিন্তু খুলআ-এর ক্ষেত্রে স্ত্রী সাধারণত দেনমোহর বা তার অংশ ফেরত দিয়ে মুক্ত হন।

বিচ্ছেদের পর আর্থিক ও সন্তানের দায়িত্ব

বিচ্ছেদের পরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ হক বাকি থাকে, যা স্বামীকে অবশ্যই পূরণ করতে হবে:

  • দেনমোহর: তালাকের পর স্বামীকে স্ত্রীকে দেনমোহর সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে (যদি আগে না দিয়ে থাকে)।
  • ভরণ-পোষণ: ইদ্দত চলাকালীন স্ত্রী ভরণ-পোষণ পাওয়ার অধিকারী।
  • সন্তানের দায়িত্ব: সন্তানের ভরণ-পোষণ ও শিক্ষার দায়িত্ব প্রধানত পিতার ওপরই থাকে। তবে সন্তানের লালন-পালন ও হেফাজত (Custody) শিশুর স্বার্থ অনুযায়ী সাধারণত মায়ের ওপর ন্যস্ত হতে পারে।

বিচ্ছেদ এড়াতে চূড়ান্ত পদক্ষেপ

তালাক বা খুলআ-এর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইসলাম সম্পর্ক বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন: “যদি তারা মীমাংসা করতে চায়, তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিল ঘটিয়ে দেবেন।” (সূরা নিসা: ৩৫)

বিচ্ছেদের আগে করণীয়:

  1. খোলামেলা আলোচনা: নিজেদের মধ্যে ধৈর্য ধরে কথা বলা।
  2. সালিশ/মধ্যস্থতা: যখন নিজেদের মধ্যে সমাধান না হয়, তখন উভয় পরিবার থেকে বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী বা সালিশ নিয়োগ করা।
  3. ইস্তিখারা ও দোয়া: আল্লাহর কাছে সঠিক পথ দেখানোর জন্য ইস্তিখারা করা এবং পরিবারে ভালোবাসা ও রহমতের জন্য দোয়া করা।

বিচ্ছেদ জীবনের শেষ বিকল্প। যদি আপনার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং সম্পর্কে ফিরে আসার আর কোনো পথ খোলা না থাকে, তবেই ন্যায্য পথে বিচ্ছেদের আশ্রয় নিন।

📖 যারা বিস্তারিত জানতে চান, তারা মূল গ্রন্থ “কুরআন হাদীসের আলোকে পারিবারিক জীবন – হযরত আশরাফ আলী থানবী রহ.” পড়তে পারেন।

❓ তালাক, খুলআ ও সন্তান লালন–পালন – সাধারণ জিজ্ঞাসা

তালাক কেন ইসলামে অপছন্দনীয় হলেও বৈধ?

অসহনীয় সম্পর্ক থেকে মুক্তির বৈধ পথ হিসেবে রাখা হয়েছে; তবে এতে পরিবার ও সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে এটি অপছন্দনীয়।

তালাকের সবচেয়ে বড় ক্ষতি কী?

সন্তানের মানসিক আঘাত, আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল হওয়া, আর্থিক ও সামাজিক অস্থিরতা।

স্ত্রীর খুলআ (বিচ্ছেদ) নেওয়ার নিয়ম কী?

স্ত্রী ন্যায্য কারণে দেনমোহর ফেরত দিয়ে খুলআ চাইতে পারে। সালিশ/কাজীর মাধ্যমে এটি কার্যকর হয়।

তালাক ও খুলআ—দুটির মধ্যে পার্থক্য কী?

তালাক স্বামীর প্রদত্ত বিচ্ছেদ, খুলআ স্ত্রীর আবেদনমূলক বিচ্ছেদ। তালাকে দেনমোহর থাকে; খুলআয় সাধারণত ফেরত দেওয়া হয়।

দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদ হলে সন্তানের দায়িত্ব কার ওপর?

ভরণ–পোষণের প্রধান দায়িত্ব পিতার; হেফাজত শিশুর মঙ্গলের ভিত্তিতে মায়ের কাছে দেওয়া যেতে পারে।

তালাক দিলে দেনমোহর ও খোরপোষের বিধান কী?

দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে। ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রী ভরণ–পোষণ ও সন্তানের খরচ স্বামীর দায়িত্ব।

তালাক দেওয়ার সঠিক ইসলামি পদ্ধতি কী?

একবার তালাক দিয়ে ইদ্দত পর্যন্ত অপেক্ষা করা সুন্নাহ। একসাথে তিন তালাক দেওয়া গুনাহ।

তালাকের পর পুনরায় মিলনের সুযোগ আছে কি?

রাজই তালাক হলে ইদ্দতের মধ্যে রুজু করা যায়; ইদ্দত পার হলে নতুন আকদ করতে হয়। তিন তালাক হলে বিশেষ শর্ত প্রযোজ্য।

সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষায় গড়ে তুলতে পারিবারিক পরিবেশ কেমন হওয়া জরুরি?

নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, হালাল–হারাম সচেতনতা, সত্যবাদিতা ও আদব চর্চার পরিবেশ।

স্বামী–স্ত্রীর বিচ্ছেদ সন্তানের ওপর কী প্রভাব ফেলে?

সন্তান মানসিক অস্থিরতা, নিরাপত্তাহীনতা ও শিক্ষাগত ক্ষতির শিকার হয়। শান্তিপূর্ণ কো–প্যারেন্টিং প্রয়োজন।




আপনার মতে, দাম্পত্য কলহ নিরসনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

ফেসবুকে যারা মন্তব্য করেছেনঃ
(Visited 5 times, 1 visits today)